Web bengali.cri.cn   
চকলেট বিষয়ক মজার তথ্য
  2013-10-15 18:48:25  cri



পৃথিবীতে চকলেটের আয়ু আর বড়জোর সাত বছর। কেননা চকলেট তৈরীর মূল উপাদান বা কাঁচামাল কোকো ফলের উত্পাদান বিরল হওয়ায় চকলেট-প্রিয়দের জন্য এটি দুঃসংবাদই বটে। আর মাত্র সাত বছর! এর পরই পৃথিবীতে চকলেট বলে আর কোনো বস্তু থাকবে না।

চকলেট বিরল হওয়ার আশঙ্কাটা এসেছে মূলত কোকো ফলের উত্পাদন কমে যাওয়ার কারণে। গেল সপ্তাহেই চকলেটের ভবিষ্যত্ নিয়ে এর বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় বসেছিলেন। সেখানে উঠে এসেছে এর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের ব্যাপারটা। ওই আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, বর্তমানে পৃথিবীতে যে পরিমাণ কোকো উত্পাদিত হয় আর পৃথিবীময় চকলেটের যে চাহিদা, তাতে পৃথিবী কোকোহীন হয়ে পড়বে ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যেই। আপাতত এর কোনো সমাধান নেই বলেও ওই আলোচনায় একমত হয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কোকোর ঘাটতির মূল কারণ চাহিদা অনুযায়ী চাষাবাদ না হওয়া। এ ব্যাপারটি কিছুটা প্রাকৃতিকও। কোকো পৃথিবীর যেকোনো আবহাওয়া কিংবা যেকোনো জায়গায় উত্পাদন করা সম্ভব নয়। চকলেট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে মোট চাহিদা অনুযায়ী চকলেট উত্পাদন করতে যে পরিমাণ কোকোর দরকার, তা প্রাকৃতিকভাবেই উত্পাদনে অক্ষম এই পৃথিবী। পৃথিবীর মাপ অনুযায়ী আরও একটি গ্রহের সবটুকু ভূমিতে যদি কোকো উত্পাদিত হয়, তবেই এর সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব।

যখন আমরা এত সুস্বাদু চকলেট খাই, কেউই জানে না যে তা আসলে মেক্সিকোর আদিবাসী আজটেক জনগোষ্ঠী তা উদ্ভাবন করেছে। আসলে গণহত্যা, রক্তক্ষয় সংঘর্ষ এবং নিষ্ঠুর উপনিবেশ পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে ইউরোপে চকলেট প্রবেশ করেছে। হ্যাঁ, কে জানে, আসলে এত মিষ্টি সুস্বাদু আর লোভনীয় চকলেটের পিছনে ছিল খুব নিষ্ঠুর এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। ইতিহাসের বর্ণনায় দেখা যায়, স্পেনের ঔপনিবেশিক হেরেনা কোর্টেস তার বাহিনী নিয়ে মেক্সিকোর আজটেকের রাজধানী টেনোকটিট্লান অভিযান করেন, এটিই বর্তমানের মেক্সিকো শহর। তারা সেখানের সাস্কৃতিক বৈচিত্র আর সম্পদের প্রাচুর্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এর ঠিক দু'বছর পর স্পেনিশ ঔপনিবেশিক শাসক তাদের আধুনিক সামরিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের ওপর আক্রমন করে নিষ্ঠুর ভাবে নির্বিচারে গণহত্যা চালায় এবং বলতে গেলে তাদের সমস্ত সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড আর সম্পদ লুট করার পর তারা সেই স্পেনিশ ঔপনিবেশিক শহর টেনোকটিট্লান ত্যাগ করে। তবে যাওয়ার সময়ে তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে যায় স্থানীয় এক ধরনের পানীয়। তখন এ পানীয়-এর নাম হল এক্সোকোলাট(xocolatl)। ঔপনিবেশিক শাসক কোর্টেস এতে চিনি এবং ভ্যানিলা মিশিয়ে পানীয়কে আরও সুস্বাদু করে তোলে এবং সেই পানীয় তার রাজা ও রাণীকে পান করতে দেয়। রাজা এবং রাজ পরিবারের এমন সুস্বাদু ও বিশেষ ধরনের পানীয়কে ভীষণ ভীষণ রকম পছন্দ করেন। ইউরোপে চকলেট আগমনের এই হলো ইতিহাস।

সেই তখন থেকেই রাষ্ট্রীয় বা বড় আকারের মর্যাদাপূর্ণ ভোজসভায় চকলেট থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। সে সাধারণত একটি ভোজসভার জন্য এক হাজার কাপেরও বেশি পানীয় খাওয়া হয়ে থাকতো। এতক্ষণ যে পানীয়র কথা বলছি এটা ঐ কোকো ফল দিয়েই তৈরি করা হতো। সেই তখনকার সময়ে এই পানীয় এতই মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল যে কেবল পুরুষ ব্যারন এবং উচ্চবংশীয় পুরুষরাই এটা খেতে পারতো, মহিলাদের খাওয়ার কোনো সুযোগ বা অধিকার ছিল না।

আরও মজার খবর হচ্ছে তখনকার দিনে কোকো ফল এতটাই মূল্যবান ছিল যে, তা মুদ্রা হিসেবেও ব্যবহার করা যেত��� চারটি কোকো ফল দিয়ে একটি খরগোশ কেনা যেতো। এমনকি আপনার হাতে যদি দশটি কোকো ফল থাকতো, তবে তো আপনি রীতিমত একজন মহিলাও পেতে পারতেন। আর যদি আপনার হাতে একশ'টি কোকো ফল থাকে, তাহলে আপনার একজন ক্রতদাস কিনতে পারেন। বুঝতেই পারছেন সেই ১৬ শতাব্দীতে কোকো পানীয় কেন শুধুমাত্র রাজা, রাজকুমার বা ব্যারনের বিলাসী খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত হতো। আপনি এটা জেনে আরও বিস্মিত হবেন যে, সে সময়ে কোকো ফলের পানীয়কে তরল সোনা বলা হতো। বর্তমান সময়ে আমরাতো খুব সহজেই এবং বেশ সস্তা দামে চকলেট কিনতে পারি। কিন্তু কোকো ফলের দুঃপ্রাপ্যতার কারণে খুব শিগগিরই চকলেট আবার সেই প্রাচীণকালের মত অতি অমূল্য এক বস্তুতে পরিণত হতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাধারণ মানুষের পক্ষে তখন আর চকলেট কিনে খাওয়া সম্ভব হবে না। কেবল কাড়ি কাড়ি টাকা থাকলেই তবে কেউ চকলেটের স্বাদ নিতে পারবেন। এই ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তিত ব্যবসায়ীরাও। এমনিতেই বর্তমানে একটি চকলেট বারে কোকোর পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এতে হয়তো কোকোর স্বাদই আর পাওয়া যাবে না। বাদাম-টাদাম দিয়ে ভরাতে হবে চকলেট বার। এ মুহূর্তে চকলেটের চাহিদা ইউরোপ, আমেরিকার তুলনায় এশিয়াতেই বেশি। চকলেটের দাম বেড়ে গেলে এশিয়ার বাজারটাই হারানোর বেশি আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন
মন্তব্য
লিঙ্ক